হায় চিল : প্রকৃতি ও জীবনানন্দ

হায় চিল : প্রকৃতি ও জীবনানন্দ

হায় চিল..

চিলকে আমরা প্রখর শিকারী বলেই জানি, কিন্তু জীবনানন্দ চিলের এক অন্য সত্তা আমাদের দেখালেন,

হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে

তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে-উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!

তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে;

পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চ’লে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;

আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে

বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!

হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে

তুমি আর উড়ে-উড়ে কেঁদোনাকো ধানসিড়ি নদীটির পাশে।

জীবনানন্দ দাশ অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। তার মূল্যায়ন করতে গিয়ে সৈয়দ আলী আহসান বলছেন, ‘বর্তমানে পৃথিবী হচ্ছে বিজ্ঞানের এবং পর্যাপ্ত সামগ্রীর। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি অসম্ভবের দ্বার উদ্ঘাটিত হয়েছে যার মধ্যে আমরা ব্যতিব্যস্ত এবং দিক-ভ্রান্ত। সমযের গতিবিধিও এখন হিসেব করা যাচ্ছে না— একটি অসম্ভব দ্রুততায় আমাদের বর্তমান সময় অতীতের অস্পষ্টতায় হারিয়ে যাচ্ছে এবং আমাদের পক্ষে কোনো বিশেষ সূত্রের মধ্যেই স্থিতিশীল হওয়া সম্ভবপর হচ্ছে না। এ সময় যাঁরা কবিতা লিখছেন তাঁদের কবিতায় কোনো সুবিন্যস্ত বর্ণনা প্রস্তাবনা নেই, একটি অস্থির বিসংবাদের রেখাঙ্কন আছে। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বর্তমানকালের এই অস্থিরতার তত্ত্বকে তাঁর কবিতায় ব্যাখ্যা করেছেন। বিষ্ণু দের কবিতায় রূপকল্প, চরণবিন্যাস এবং কারুকর্মের মধ্যে যুগের অস্থিরতা প্রতিচিত্রিত হয়েছে। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ একটি বেদনাময় আত্মকেন্দ্রিকতায় আপন অস্তিত্বের চৈতন্যকে অনুভব করতে চেয়েছেন। তিনি পৃথিবীকে একটি একক অস্তিত্ব হিসেবে অনুভব করতে চেয়েছেন, যেখানে মানুষ, প্রকৃতি এবং প্রাণী একাকার হয়েছে। মানুষ শুধুমাত্র আপন সামাজিক, সাংসারিক এবং রাজনৈতিক সমস্যার মধ্যে উপস্থিত নয়, সে সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি এবং প্রাণীজগতের সঙ্গেও একটি বিশেষ আবহে একত্রিত রূপে উপস্থিত। আমরা আকাশ, মাটি, বৃষ্টি, নদী, পাথর, লতা, গাছের শাখা, স্থলচর প্রাণী এবং কলকণ্ঠের অনেক পাখি নিয়ে পৃথিবীতে বাস করি। এদের সঙ্গে অবশ্য আমাদের সংসার যাপন নয়, কিন্তু আমাদের অস্তিত্ব যাপনের মধ্যে এরা সর্ব মুহূর্ত উপস্থিত। তাই জীবনানন্দ দাশ মানুষকে প্রকৃতির বর্ণবৈচিত্র্যের মধ্যে এবং প্রাণীজগতের অবিস্থিতির মধ্যে নির্ণয় করতে চেয়েছেন। নির্ণয় করার উপায় হচ্ছে মানুষ হিসেবে আমাদের সকল অনুভূতিগুলোকে উৎকণ্ঠিত করা। এই অনুভূতিগুলো হচ্ছে দৃষ্টির অনুভূতি, ঘ্রাণের অনুভূতি, স্পর্শের অনুভূতি, স্বাদের অনুভূতি এবং শ্রবণের অনুভূতি। মানুষের সজীবতার প্রমাণ এই অনুভূতিগুলোর মধ্যে পাওয়া যায়। একমাত্র ম্রিয়মাণ মুমূর্ষু ব্যক্তির কোনো অনুভূতি নেই। কবি হিসেবে জীবনানন্দ দাশ তাঁর কর্তব্য ভেবেছিলেন এই অনুভূতিগুলোকে সকল বর্ণনার মধ্যে প্রমাণিত করা।’ (আধুনিক কবিতা : শব্দের অনুসঙ্গে, পৃ-৩৯)

জীবনানন্দ দাশ বাংলার প্রকৃতির মধ্যেই শুয়ে আছেন প্রতিদিন কিংবা এক চিল হয়ে উড়ছেন  ধানসিড়ি নদীটির পাশে এই ভিজে মেঘের দুপুরে; ” হায় চিল…”

©wikipedia

হায় চিল কবিতায় ভিজে মেঘের চিলচরা দুপুর কী ভাবে অদূরবর্তী এক, একা কবির মগ্ন মন’কে উস্কে দিচ্ছে… তাই এই কবিতার প্রধান আলোচ্য বিষয়…

-ডঃ স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

অনেকেই বলেন, তেমন আমিও বলি, রবীন্দ্রনাথের পরে জীবনানন্দ দাশই একমাত্র কবি, যাঁর কবিতাচর্চা বাংলা সাহিত্যে অনিবার্য ও অপরিহার্য। বাংলা সাহিত্যে কয়েক হাজার কবির  সম্মিলিত কাব্যচর্চা আজও সেই “রবি-জীবনানন্দ” বৃত্তাবর্তেই ঘুরছে।

তার ইতিহাসচেতনা নিয়ে বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, ‘জীবনানন্দ ছিলেন একজন কালসচেতন ও ইতিহাসচেতন কবি। তিনি ইতিহাসচেতনা দিয়ে অতীত ও বর্তমানকে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কসূত্রে বেঁধেছেন। তাঁর কবিস্বভাব ছিল অন্তর্মুখী, দৃষ্টিতে ছিল চেতনা থেকে নিশ্চেতনা ও পরাচেতনার শব্দরূপ আবিষ্কারের লক্ষ্য। এ সূত্রে তিনি ব্যবহার করেছেন ইম্প্রেশনিস্টিক রীতি, পরাবাস্তবতা, ইন্দ্রিয়বিপর্যাস (synaesthesia) ও রঙের অত্যাশ্চর্য টেকনিক। আধুনিক কাব্যকলার বিচিত্র ইজম প্রয়োগ ও শব্দনিরীক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর অনন্যতা বিস্ময়কর। বিশেষত, কবিতায় উপমা প্রয়োগে জীবনানন্দের নৈপুণ্য তুলনাহীন। কবিতাকে তিনি মুক্ত আঙ্গিকে উত্তীর্ণ করে গদ্যের স্পন্দনযু্ক্ত করেন, যা পরবর্তী কবিদের প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে।’

জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ সালে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন, বেঁচে ছিলেন  মাত্র ৫৫ বছর। ১৯৫৪ সালে ১৪ অক্টোবর ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হয়ে শম্ভুনাথ হাসপাতালে ২২ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর পরে আবিষ্কৃত হয় তাঁর কথাসাহিত্যের বিষ্ময়কর সম্ভার। ঝরা পালক ( ১৯১৮), ধূসরপান্ডুলিপি ( ১৯৩৬),বনলতা সেন ( ১৯৪২), মহাপৃথিবী ( ১৯৪৪), সাতটি তারার তিমির ( ১৯৪৯), রূপসী বাংলা ( ১৯৫৭) তার লেখা অন্যতম কাব্যগ্রন্থ। সুতীর্থ, মাল্যবান, জলপাইহাটি, কারুবাসনা, জীবনপ্রনালী, প্রেতিনীর রূপকথা, বাসমতীর উপাখ্যানবিভা তার লেখা উপন্যাস। তার লেখা হায় চিল ছাড়াও আট বছর আগে একদিন আমার প্রিয় কবিতা।

Written by :

Leave a Reply